সৌদি আরবের মেডিকেল করার সম্পূর্ণ গাইড নিয়ে বিস্তারিত পোস্ট। সৌদি আরবে কাজের ভিসা বা চাকরির জন্য যাওয়ার আগে মেডিকেল টেস্ট করা বাধ্যতামূলক। এই গাইডে সৌদি মেডিকেল করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল কিছু বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। চলুন শুরু করা যাক…
আরও: পাসপোর্ট হয়েছে কিনা চেক করবেন যেভাবে
মেডিকেল করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
সৌদি আরবের মেডিকেল করতে কি কি লাগে। এই প্রশ্নের উত্তরে, সৌদি আরবের মেডিকেল করতে নিচের ডকুমেন্টগুলো প্রয়োজন হবে:
মূল কাগজপত্র:
- আবেদনকারী ব্যক্তির পাসপোর্টে উল্লেখ করা বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হবে। ২১ বছরের ১দিন কম হলে ভিসার জন্য আবেদন করা যায় না। তাই ২১ বছরের কম হলে মেডিকেল না করার পরামর্শ থাকবে।
- বৈধ পাসপোর্ট (অবশ্যই ৬ মাসের বেশি মেয়াদ থাকতে হবে) (মেইন পাসপোর্ট এবং ১কপি ফটোকপি)
- ভিসার কপি বা ওয়ার্ক পারমিট (অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই)
- জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন (১কপি ফটোকপি)
- সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের ছবি (৪ কপি)। ছবির ক্ষেত্রে খেয়াল রাখবেন যেন আপনার পড়া জামার কালার সাদা বা এর কাছাকাছি কালার না হয়)।
- এজেন্সি বা কোম্পানির রেফারেন্স লেটার (অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই)
অতিরিক্ত তথ্য: এজেন্সি বা নিয়োগকর্তা থেকে দেওয়া মেডিকেল ফরম পূরণ করে নিয়ে যেতে হবে। অনেক সময় বায়োমেট্রিক তথ্যও সংগ্রহ করা হয়।
টেস্ট মেডিকেল কি
টেস্ট মেডিকেল হলো বিদেশে চাকরির জন্য যাওয়ার পূর্বে প্রার্থীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা যাচাই করার একটি প্রক্রিয়া। এটি মূলত একটি স্বাস্থ্য পরীক্ষা যেখানে রক্ত পরীক্ষা, বুকের এক্স-রে, মূত্র পরীক্ষা এবং সাধারণ শারীরিক পরীক্ষা করা হয় যাতে নিশ্চিত করা যায় যে প্রার্থী কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত নয় এবং কাজ করার জন্য শারীরিকভাবে সক্ষম।
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজের ভিসা পাওয়ার জন্য এই মেডিকেল টেস্ট পাস করা আবশ্যক। টেস্ট মেডিকেলের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। সাধারণত GAMCA (Gulf Approved Medical Centers Association) অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে এই পরীক্ষা করা হয় এবং রিপোর্ট পেতে ১-২ দিন সময় লাগে।
পরামর্শ: মূল বা ফাইনাল মেডিকেল করার আগে একটা টেস্ট মেডিকেল করিয়ে নিতে পারেন। এতে সহজেই বুঝতে পারেন আপনার বড় কোন রোগ বা সমস্যা আছে কিনা। এটা করতে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা লাগে এবং ১ দিনেই রিপোর্ট পাওয়া যায়।
কোথায় মেডিকেল করতে হবে
অনুমোদিত হাসপাতাল ও ক্লিনিক: সৌদি আরব সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হাসপাতাল বা মেডিকেল সেন্টারে মেডিকেল করাতে হবে। বাংলাদেশে বেশ কিছু সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এই সেবা দেয়। ঢাকায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, বারডেম হাসপাতাল, এবং বেশ কিছু বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে যেখানে এই মেডিকেল করা যায়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: অবশ্যই GAMCA (Gulf Approved Medical Centers Association) অনুমোদিত সেন্টার হতে হবে। এজেন্সি বা নিয়োগকর্তা নির্দিষ্ট সেন্টারের নাম দিতে পারে।
মেডিকেল সেন্টার এর লিস্ট দেখুন: https://wafid.com/medical-center/search/
মেডিকেল টেস্টের ধরন
সৌদি আরবের মেডিকেলে সাধারণত নিম্নলিখিত পরীক্ষা করা হয়:
রক্ত পরীক্ষা:
- HIV/AIDS টেস্ট
- হেপাটাইটিস বি এবং সি টেস্ট
- ম্যালেরিয়া টেস্ট
- সিফিলিস টেস্ট
- রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ
শারীরিক পরীক্ষা:
- বুকের এক্স-রে (টিবি শনাক্তকরণের জন্য)
- হার্ট এবং ব্লাড প্রেসার পরীক্ষা
- চোখের পরীক্ষা
- শারীরিক ফিটনেস যাচাই
- মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন
মূত্র পরীক্ষা: মাদকদ্রব্য ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা শনাক্তকরণের জন্য।
মেডিকেল প্রক্রিয়া
ধাপ ১: নিবন্ধন প্রথমে মেডিকেল সেন্টারে গিয়ে সকল কাগজপত্র জমা দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। এখানে আপনার তথ্য কম্পিউটারে এন্ট্রি দেওয়া হবে এবং একটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেওয়া হবে। চাইলে এজেন্সির সহায়তা নিতে পারেন।
ধাপ ২: ফি প্রদান নির্ধারিত মেডিকেল ফি পরিশোধ করতে হবে। বর্তমানে এর খরচ ৮,৫০০ থেকে ১২,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যা সেন্টার ভেদে ভিন্ন হয়।
ধাপ ৩: পরীক্ষা সম্পন্ন করা সকালে খালি পেটে গিয়ে রক্ত ও মূত্র পরীক্ষা করাতে হয়। এরপর এক্স-রে এবং শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
ধাপ ৪: রিপোর্ট সংগ্রহ সাধারণত ২-৫ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট পাওয়া যায়। কিছু সেন্টারে একই দিন বা পরদিনও রিপোর্ট দেয়।
মেডিকেল ফিট না হলে কি করবেন
যদি কোনো কারণে আপনি মেডিকেলে অযোগ্য বলে বিবেচিত হন, তবে:
- প্রথমে জানুন কোন টেস্টে সমস্যা হয়েছে
- প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়ার পর পুনরায় মেডিকেল করুন
- কিছু ক্ষেত্রে আপিল করার সুযোগ থাকে (সৌদি আরবের ক্ষেত্রে ২য়বার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম)
- এজেন্সি বা নিয়োগকর্তার সাথে যোগাযোগ করুন
সাধারণ অযোগ্যতার কারণ: টিবি, হেপাটাইটিস, HIV, মানসিক অসুস্থতা, মাদকাসক্তি ইত্যাদি।
মেডিকেলের মেয়াদ
সৌদি আরবের মেডিকেল রিপোর্ট সাধারণত ৩ মাস পর্যন্ত বৈধ থাকে। তাই মেডিকেল করার পর দ্রুত ভিসা প্রসেসিং শুরু করা উচিত। এই বিষয়টা আপনার RL এজেন্সির সাথে আপ-টু-ডেট থাকবেন।
গুরুত্বপূর্ণ টিপস
মেডিকেলের আগে:
- পর্যাপ্ত ঘুম নিন এবং সুস্থ থাকুন
- সকালে খালি পেটে যান (পানি পান করতে পারবেন) (তবে আবশ্যক নয়)
- যদি কোনো ওষুধ খান, তা ডাক্তারকে জানান
- ধূমপান এবং মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন
মেডিকেলের দিন:
- সকাল ১০-১১টার মধ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন
- সকল কাগজপত্র গুছিয়ে রাখুন
- আরামদায়ক পোশাক পরুন
- প্রয়োজনীয় টাকা সাথে রাখুন
খরচের হিসাব
সৌদি মেডিকেলের জন্য মোট খরচ:
- মেডিকেল টেস্ট ফি: ৮,৫০০ – ১২,০০০ টাকা
- এজেন্সি সার্ভিস চার্জ (যদি থাকে): ৫০০ – ১৫০০ টাকা
- যাতায়াত ও অন্যান্য: ৫০০ – ১,০০০ টাকা
মোট আনুমানিক খরচ: ১১,০০০ – ১৫,০০০ টাকা
সৌদি আরবের মেডিকেল নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
সৌদি আরবের মেডিকেল কতদিন বৈধ থাকে?
সৌদি আরবের মেডিকেল রিপোর্ট সাধারণত ৩ মাস পর্যন্ত বৈধ থাকে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এজেন্সি বা নিয়োগকর্তা ভেদে এই সময়সীমা ভিন্ন হতে পারে।
মেডিকেল রিপোর্ট পেতে কত দিন লাগে?
সাধারণত ২-৫ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট পাওয়া যায়। জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত ফি দিয়ে একই দিন বা পরদিন রিপোর্ট সংগ্রহ করা যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে এটা ১৫ দিন বা তারও বেশি সময় নিতে পারে।
কোন কোন রোগ থাকলে মেডিকেল পাস হবে না?
HIV/AIDS, সক্রিয় টিবি, হেপাটাইটিস বি ও সি, মানসিক অসুস্থতা, মাদকাসক্তি, এবং গুরুতর হৃদরোগ থাকলে সাধারণত মেডিকেল পাস হয় না।
GAMCA কি এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
GAMCA (Gulf Approved Medical Centers Association) হলো উপসাগরীয় দেশগুলোর একটি স্বীকৃত সংস্থা যা মেডিকেল সেন্টারগুলোকে অনুমোদন দেয়। শুধুমাত্র GAMCA অনুমোদিত সেন্টারের মেডিকেল রিপোর্টই সৌদি আরবে গৃহীত হয়।
চশমা ব্যবহার করলে কি সমস্যা হবে?
না, চশমা ব্যবহার করা কোনো সমস্যা নয়। তবে চোখের গুরুতর সমস্যা যেমন অন্ধত্ব, রঙ্গিন দৃষ্টিহীনতা ইত্যাদি থাকলে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।
শরীরে কাটাদাগ থাকলে কি সমস্যা হবে?
সমস্যা হবে না। তবে, যদি কাটাদাগ বড় হয় বা একাধিক হয় তাহলে সমস্যা হতে পারে। এক্ষেত্রে এজেন্সির সাথে কথা বলে নিতে পারেন।
মহিলাদের জন্য কি কোনো বিশেষ নিয়ম আছে?
মহিলাদের জন্য প্রেগনেন্সি টেস্ট করা হয়। গর্ভবতী থাকলে বুকের এক্স-রে করা হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে মেডিকেল স্থগিত রাখা হয়। এছাড়া মহিলা ডাক্তার দ্বারা পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা থাকে।
ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কি মেডিকেল পাস হবে?
নিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ সাধারণত সমস্যা নয়। তবে অবশ্যই নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে এবং পরীক্ষার সময় রিপোর্ট দেখাতে হতে পারে।
মেডিকেল রিপোর্ট হারিয়ে গেলে কি করব?
মেডিকেল সেন্টার থেকে ডুপ্লিকেট কপি সংগ্রহ করা যায়। এজন্য রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং পরিচয়পত্র প্রয়োজন হবে। কিছু ফি লাগতে পারে।
সৌদি আরবে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে অবশ্যই বিশ্বস্ত এজেন্সির মাধ্যমে যান এবং সকল প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করুন। মেডিকেল একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, তাই এতে কোনো প্রকার অসাবধানতা করবেন না। সুস্থ থাকুন এবং সফল হোন! যদি কোন বিষয় না বুঝেন অথবা মেডিকেল করতে চাইলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
ফেসবুক: Kuhudak

